ঋণ নিয়ন্ত্রণ বলতে কি বুঝায়? কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঋণ নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি

Rate this post

ভূমিকা : ঋণ হচ্ছে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান বা ব্যাংক কর্তৃক প্রদত্ত ধার। আর নিয়ন্ত্রণ বলতে ঋণের পরিমাণ প্রয়ােজনীয় মাত্রায় ধরে রাখাকে বুঝায়।

ঋণ নিয়ন্ত্রণ বলতে কি বুঝায়?

যে পদ্ধতিতে সরকারের পক্ষে কেন্দ্রীয় ব্যাংক দেশের মুদ্রাবাজারে ঋণের পরিমাণ কাম্য স্তরে রাখে,তাকে ঋণ নিয়ন্ত্রণ বলে।

প্রামাণ্য সংজ্ঞা : ঋণ নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কে বিভিন্ন সংজ্ঞা নিম্নরূপ- P.H. Collin-এর মতে,

“ঋণ নিয়ন্ত্রণ বলতে যথা সময়ে গ্রাহকের ঋণ পরিশােধ ও ঋণের সীমা অতিক্রম থেকে বিরত রাখাকে বুঝায়।

” Shekhar and Shekhar-এর মতে,

“অভ্যন্তরীণ মূল্যমান স্থিতিশীল রাখাকে ঋণ নিয়ন্ত্রণ বলে।”

W. R. Burgress-এর মতে,

“ঋণ নিয়ন্ত্রণ বলতে ব্যবসায় বাণিজ্যের সাথে সঙ্গতি রেখে ঋণের পুরােপুরি সামঞ্জস্য বিধান করাকে বুঝায়।
ঋণ নিয়ন্ত্রণ বলতে কি বুঝায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঋণ নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি
ঋণ নিয়ন্ত্রণ বলতে

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঋণ নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি কি কি?

কেন্দ্রীয় ব্যাংক দুইটি পদ্ধতির মাধ্যমে ঋণ নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। তা হলাে নিম্নরূপ :

(ক) পরিমাণগত ঋণ নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি : যে সকল পদ্ধতির মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংক কর্তৃক সৃষ্ট ঋণের পরিমাণের সংকোচন ও সম্প্রসারণ ঘটায় তাকে পরিমাণগত ঋণ নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি বলে । পরিমাণগত ঋণ নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির তিনটি উপকরণ বা নীতি হলাে-

১. ব্যাংক হারের পরিবর্তন নীতি : কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলাের দ্বারা ঋণ দেয়ার সময় সুদের হার বৃদ্ধি করবে যাতে করে সহজে সুদে জনসাধারণকে বেশি ঋণ না দিতে পারে। ব্যাংক হার বৃদ্ধি করলে দেশের ঋণের পরিমাণ হ্রাস পায় এবং ব্যাংক হার হ্রাস করা হলে ঋণের যােগান বৃদ্ধি পায়।

২. খােলা বাজার নীতি : কেন্দ্রীয় ব্যাংক খােলা বাজারে ঋণপত্র বিক্রয় করে জনসাধারণের হাত থেকে নগদ টাকা তুলে নেয়। নগদ টাকা হাস পাওয়ার ফলে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলাের ঋণদানের ক্ষমতা হ্রাস পায়। আবার বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলাের ঋণের প্রসার ঘটানাে প্রয়ােজন হলে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক খােলা বাজারে ঋণপত্র ক্রয় করে। সে অবস্থায় বাণিজ্যিক ব্যাংকের আমানত বেড়ে যায়। ফলে ঋণের পরিমাণ বাড়ে।

৩. নগদ জমার হার পরিবর্তন নীতি : কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিকট বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলােকে নির্দিষ্ট হারে আমানতের একটি অংশ জমা রাখতে হয়, তাকে নগদ জমার হার বলে । কেন্দ্রীয় ব্যাংক যখন বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলাের ঋণ দানের পরিমাণ কমাতে চায়, তখন নগদ জমাব হার বাড়িয়ে দেয়। আবার যখন ঋণের প্রসার ঘটানাের প্রয়ােজন হয় তখন নগদ জমার হার কমিয়ে দেয় । পরিমাণগত ঋণ নিয়ন্ত্রণের উল্লেখিত তিনটি পদ্ধতিকে প্রত্যক্ষ বা বাধ্যতামূলক ঋণ নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি বলে অর্থাৎ, এ তিনটি পদ্ধতির দ্বারা কেন্দ্রীয় ব্যাংক সরাসরি ঋণদান কার্যক্রমে হস্তক্ষেপ করে।

(খ) গুণগত ঋণ নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি : কেন্দ্রীয় ব্যাংক যেসব পদ্ধতির দ্বারা অর্থনীতির বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে এবং বিশেষ উদ্দেশ্যে ঋণ নিয়ন্ত্রণ করে তাদেরকে গুণগত ঋণ নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি বলে। নৈতিক চাপ ও প্রচারের মাধ্যমে বাণিজ্যিক ব্যাংকের ঋণ দানের উপর প্রভাব বিস্তার করে। নিম্নে গুণগত পদ্ধতিগুলাে নিচে আলােচনা করা হলাে :

১. ঋণের বরাদ্ধকরণ নীতি ও বাণিজ্যিক ব্যাংক কর্তৃক প্রদত্ত ঋণের উদ্দেশ্যসমূহ পরিমিত ও নিয়ন্ত্রণ করাকে ঋণের বরাদ্দকরণ নীতি বলা হয়। এ নীতির প্রধান লক্ষ্য হলাে বাণিজ্যিক ব্যাংকের মােট অগ্রিম ও ঋণের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করা। কোনাে কোনাে ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ঋণ প্রদানের সীমা নির্ধারণ করে দেয়।

২. ভােগকারীর ঋণ নিয়ন্ত্রণ : বর্তমানে অনেক দেশে স্থায়ী ভােগ্য পণ্য কেনার সময় কিস্তিতে দাম পরিশােধ করার সুযােগ দেওয়া হয়। কিস্তির সংখ্যা বেশি হলে লােকের বেশি জিনিস কেনার ইচ্ছা হবে। ফলে ঋণের চাহিদা বাড়বে। কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্তৃপক্ষ কিস্তির সংখ্যা কমিয়ে এবং দাম পরিশােধের সময় সংক্ষেপ করে দিলে ভােগ্য পণ্য ক্রয়ের জন্য ঋণের চাহিদা কমবে।

৩. প্রত্যক্ষ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা : কোনাে বাণিজ্যিক ব্যাংকে ঋণদান নীতি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঋণ নিয়ন্ত্রণ নীতির সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ হলে অথবা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি অনুসরণ না করলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের বাট্টাকরণ সুবিধা প্রত্যাহার করে অথবা বৈষম্যমূলক ব্যাংক হার আরােপ করে। ফলে ব্যাংকের ঋণদান ক্ষমতা সংকুচিত হয়। এ ব্যবস্থাকে প্রত্যক্ষ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা বলে।

৪. জামাতি ঋণের নগদাংশ হ্রাস-বৃদ্ধি : অনেক সময় কেন্দ্রীয় ব্যাংক জামাতি ঋণের একটা নির্দিষ্ট অংশ নগদ কেটে রেখে ঋণ নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। এ পদ্ধতির দ্বারা কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফটকা কারবারীদের বিভিন্ন প্রকার শেয়ার ও সিকিউরিটিজ জামানতের বিনিময়ে বাণিজ্যিক ব্যাংক প্রদত্ত ঋণের নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।

৫. নৈতিক প্ররােচনা : বাণিজ্যিক ব্যাংকের ব্যাংক হিসেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কাজ করে। কাজেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক যখন তাদের বুঝানাের চেষ্টা করে যে, এখন ঋণের পরিমাণ বাড়ানাে বা কমানাে উচিত, তখন তারা সেই অনুরােধ রক্ষা করে কাজ করে।

৬. নির্বাচিত ক্ষেত্রে ঋণ নিয়ন্ত্রণ: একটি দেশে অনুৎপাদনশীল ও অপ্রয়ােজনীয় খাত থেকে উৎপাদনশীল খাতে মূলধন তথা ঋণের স্থানান্তর প্রয়ােজন হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংক অপ্রয়ােজনীয় ও প্রয়ােজনীয় খাত চিহ্নিত করে বাণিজ্যিক ব্যাংককে নির্দেশ দিতে পারে কোন খাতে ঋণের প্রসার এবং কোন খাতে ঋণের সংকোচন প্রয়ােজন।

৭. প্রচারণামূলক পদ্ধতি : কেন্দ্রীয় ব্যাংক অনেক সময় ঋণের যােগান ও ঋণ নিয়ন্ত্রণ বিষয় সম্পর্কে জনগণকে অবহিত করার জন্য প্রচারের আশ্রয় গ্রহণ করে। এর ফলে ঋণের যােগান নিয়ন্ত্রিত হয়।

আরো পড়ুনঃ চলক ও ধ্রুবকের মধ্যে পার্থক্য

উপসংহার : উপরিউক্ত আলােচনার প্রেক্ষিতে বলা যায়, কেন্দ্রীয় ব্যাংক সমগ্র ব্যাংকের অবিভাবক হিসেবে উপরিউক্ত ব্যবস্থাসমূহ গ্রহণের মাধ্যমে ঋণ নিয়ন্ত্রণ করে থাকে।

1 thought on “ঋণ নিয়ন্ত্রণ বলতে কি বুঝায়? কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঋণ নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি”

Leave a Comment